শিউলি ফুলে হাসি

প্রিয় নোয়াখালীঃ ফজরের আজান হচ্ছে। শীতের ভোর।
এখনো ঠিকমতো আলো ফোটেনি চারপাশে। সুখেনপুর গ্রামে এবার বোধহয় শীতটা আগেভাগেই চলে এলো।

পানা পুকুরটার চারপাশে ছোট বড় খেঁজুর গাছের জটলা। কেউ লাগায় না, নিজের থেকেই হয়। বড় সবকটা গাছেই রস লাগায় নদী পাড়ের কুসুমকরির জামাই। তার একটা গাছে বেঁধে রাখা হাড়ি থেকে কী সুখ নিয়েই না রস খাচ্ছে পাখিটা! পাশেই কালচে সবুজ রঙের ধানক্ষেত, ধানের শিষে শিশির বিন্দু!
একটি বসতবাড়ি দেখা যাচ্ছে! টিনের চালায় লাউ গাছটার লতা এখনও আড়মোড়া ভাঙেনি। এই শীত শীত সকালে ৯-১০ বছরের কাজল ঘুম থেকে উঠলো বেশ পড়িমড়ি করেই। চাদরটা গায়ে মুড়ি দিয়ে ঘর থেকে বের হয়েই দে ছুট। শুধু বললো, মা গেলাম! গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে প্রায় দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ছুটে যাচ্ছে কাজল।
– আজ আমাকে পেতেই হবে। আমি একদিনও পাই না। সবগুলো নিয়ে নেয় বড় গাঁয়ের ধামড়া ছেলেগুলো। আজ আমি সবার আগে গিয়ে সব নিয়ে নেবো।

সুখেনপুরের একমাত্র বড় বাড়ি হলো কাজী বাড়ি। এরা খানদানি বংশ। বর্তমান মালিক কাজী আজিজুর রহমানের বয়স প্রায় ৬০। ছেলেমেয়ে সবাই থাকে শহরে তবে গ্রামের মায়া ছেড়ে তিনি শহরে থাকতে রাজি হননি। তাছাড়া গ্রামের মানুষগুলো বিপদে আপদে নানা পরামর্শের জন্য তার ওপর নির্ভর করে। বড় পাঁচিলে ঘেরা এই বাড়ি নানা রকম ফুল আর ফল গাছে ভরা। গ্রামের অনেক মানুষেরই এই বাড়ির অন্দরমহল নিয়ে বেশ আগ্রহ রয়েছে।
কাজী বাড়ির দীর্ঘদিনের কাজের লোক নজরুল মিয়া নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজছে। হঠাৎ ছেলেপুলেদের ধুপ ধাপ পায়ের শব্দে বাগানের পেছনের দিকে ছুটে যায় নজরুল ।

একদল বাচ্চা দৌঁড়ে বের হয়ে যায় ভাঙা পাঁচিলের অংশ দিয়ে। যাওয়ার সময় ঢিঁল মেরে ক্ষেপিয়ে দিয়ে যায় নজরুল মিয়াকে।
কাজল ততক্ষণে এসে দাঁড়ায় কাজী বাড়ির গেটে। বড় বড় ছেলেগুলো আজও নিয়ে গেছে সব শিউলি। আজ চারদিন, প্রতিদিনই কাজল ফিরে যায় গেট থেকে।
ছোট একটা ছেলে প্রতিদিনই হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। বেচারা!

ব্যাপারটা ছাদের কার্নিশ থেকে কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছেন কাজী আজিজুর রহমান। ফজরের নামাজের জন্য বেশ তাড়াতাড়িই উঠতে হয় তাকে। ইদানীং অবশ্য রাতে ঘুমই হয় না। বয়সটাও বাড়ছে হু হু করে! স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়িটা যেন এক বিরাণ ভূমি। বেশির ভাগ ফুলের চারাই অযত্নে অবহেলায় মরে গেছে। বাকি আছে শুধু ওই শিউলি গাছটা। ফলের কিছু গাছ অবশ্য এখনো টিকে আছে নজরুলের কল্যাণে। অপরিচিত বাচ্চাটার করুন মুখটা সাঁঝ সকালে মনটাই খারাপ করে দেয়।
আরেকটা ভোর আসে, কাজল যথারীতি উপস্থিত। তবে আজও সে শূন্যহাতে দাঁড়িয়ে আছে, চোখ ছলচল! কাজী সাহেব নজরুলকে আদেশ দিলো বাচ্চাটিকে তার কাছে নিয়ে আসার জন্য। নজরুল খুব আনন্দ নিয়ে কাজলকে টেনে নিয়ে গেল কাজী সাহেবের কাছে। আজই তগো কপালে খারাবি আছে! ফুল চুরি করো না?
কাজল কাছে গিয়েই বলতে লাগলো,
– আমি তো চুরি করিনি। গাছের নিচে পড়ে থাকা ফুলগুলো নিতে আসি, তাও পাই নাই একদিনও! বড় ছেলেগুলো নিয়ে যায়। তবুও আমাকেই কেন ধরে নিয়ে আসলেন।
কাজী সাহেব কান্নাভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কি নিষ্পাপ একটা মুখ। কাজী সাহেব হাত বাড়িয়ে এক ঝুড়ি শিউলি ফুল তুলে দিলো কাজলের হাতে। কাজল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। কাজী সাহেব বললেন, আমি এখন থেকে তোর জন্য ফুল রেখে দেবো! নিয়ে যাস। কটমট চোখে কাজী সাহেবের আদর আদর আচরণ দেখে থাকে নজরুল মিয়া। তার ধারণা ছিলো উল্টো। – যখনই কাজী সাহেব কাজলকে ফুলের ঝুড়িটা দিতে যাবে নজরুল বলে ওঠে -সাহেব ওদের ফুল দেন কেন? এরা আমাগো ফুল দিয়া বেদাতি কাম করবো! পূজা দিবো! আর আমাগো পাপ হইবো! কাজী সাহেব এবার হাসতে হাসতে বলে উঠলেন- থামতো নজরুল..বাচ্চা মানুষ !..ওর মন খারাপ হলে পাপ আরো বেশী হবে !!

কাজল ঝুড়ি হাতে ছুটলো বাড়ির দিকে। বাড়ি ফিরেই ডাকলো মাকে। ঐ তো মা। কাজল মায়ের আঁচল ধরে টান দিলো। সাদা শাড়ি, হাতে শাখা, সিঁথিতে সিঁদুর মাখানো এক শ্যামবর্ণ মুখ কিছুটা উৎকণ্ঠা নিয়ে ফিরলো কাজলের দিকে।
– কিরে আজও পাসনি। তুই কেন যাস বলতো! এত কষ্ট করে মন খারাপ করে ফিরিস। ফুল ছাড়াও পূজো হয়। দেবতা কি ফুল দেখেন! দেবতা ভক্তি দেখেন।
কাজল বলে, – কিন্তু তুমি যে শিউলি পছন্দ করো। বলেছিলে না যে একদিন! তাই তো আনতে যাই তোমার জন্য।
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে হাসলো সন্ধ্যা।
ছেলেটাই তার সম্বল! এই গ্রামে বেশ কিছু হিন্দু ঘরের বসবাস। সবাই ছোটখাট কাজ করে। ভালো একটু রোজগারের আশায় কাজলের বাবা গেছে শহরে। মাসে একবার আসে ঘরে। ছেলেটাকেই নিয়ে কাটে সময়।
পূজায় ফুল লাগে। তবে এদিকে ফুলের আকাল থাকায় ফুল ছাড়াই পূজা করতে হয়। তবে কাজল কিভাবে যেন জানলো কাজী বাড়ি থেকে অনেকেই ফুল আনে পূজার জন্য। তাই মায়ের জন্য সাত সকালেই ছোটে কাজী বাড়ি।
এই নাও তোমার ফুল, বলেই পেছন থেকে ঝুড়ি ভর্তি শিউলি দিলো মা’র হাতে। মা ছেলের কপালে চুমো খেয়ে ফুলগুলো দিয়ে পূজা শুরু করলো দেয়ালে টাঙানো দেবতার ছবির সামনে।
এরপর থেকে কাজল প্রতিদিনই যায় কাজী বাড়ি। তবে খুব চিন্তিত থাকে না যে ফুলগুলো ছেলেরা নিয়ে যাবে নাতো এই ভেবে।
কাজী সাহেব আজানের আগেই ঘুম থেকে ওঠেন। কোনদিনই নামাজ কাজা হয়নি তাঁর। শিউলিগুলো সাদা চাদরের মতো বিছানো থাকে নিচে। নজরুলকে বললেই কুড়িয়ে দিবে। তবে নিজে তুলতে এক ধরনের আনন্দ লাগে, মনে হয় ছেলেবেলায় ফিরে গেছেন। এই গ্রামেই তার বেড়ে ওঠা ! ছেলে বেলায় এই বাড়িতেই ছিল বিশাল বাগান ! হরেন কাকার বউ ঘোমটা দিয়ে খুব লাজুক ভাবে সকালে আসতো , মা আর উনি দুজন মিলে কুড়াতো নানা রকমের ফুল । দুজনের ভাব ছিল বেশ ! পূজার সময় কত যে নাড়– যে খাওয়া হতো কাকীর হাতে। গ্রামে এখন সেই সময় নেই ! কোথাও কোথাও সংঘর্ষের খবরও পান তিনি ! কেন এমন হলো মানুষ গুলো ! আগে তো মানুষ এখনের চেয়ে বেশী ধার্মিক ছিল। কই হিন্দু- মুসলিমে এত ঝামেলা তো হত না! আফসোস মানুষ বোধ হয় ধর্ম কি তাই জানে না । !

– যখন কাজলকে ঝুড়িটা দেওয়া হয় কী যে খুশি হয় ছেলেটা। মনটাই তাজা হয়ে যায়। ফুলগুলো তুলতে তুলতে ফজরের আজান দিয়ে দেয়। নামাজে যেতে হবে। কাজলের জন্য ঝুড়িটা রেখেই নামাজ পড়তে যান কাজী সাহেব। এক ঝুড়ি শিউলি প্রতি সকালে হাসি ফোটায় কয়েকটি মুখে! এটাই শিউলির ধর্ম ।

Share Button

সর্বশেষ আপডেট



» চাটখিলের রামনারায়নপুরে যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন

» আবারও দক্ষিণ আফ্রিকায় ডাকাতের গুলিতে নোয়াখালীর যুবক খুন

» রামগঞ্জে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বিধবার উপর হামলা

» এএসপি পদোন্নতিতে লিটনকে চাটখিলে সংবর্ধনা

» বেগমগঞ্জে মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীকে বলৎকার, ২ কিশোর আটক

» চাটখিল ও সোনাইমুড়ীতে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও অনুদান দিলেন জাহাঙ্গীর আলম 

» ধর্ষকদের জন্য আ’লীগের দরজা চিরতরে বন্ধ:ওবায়দুল কাদের

» বাহরাইনে সড়ক দূর্ঘটনায় সেনবাগের হিরন নিহত

» চাটখিলে ধর্ষক শরীফের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে জনতার মানববন্ধন

» গুলি ফুটিয়ে ভয় দেখিয়ে আরেক নারীকে ধর্ষন যুবলীগ নেতা শরীফের

ফেইসবুকে প্রিয় নোয়াখালী

সম্পাদক ও প্রকাশক:: কামরুল ইসলাম কানন।
যোগাযোগ:: ০১৭১২৯৮৩৭৫১।
ইমেইল [email protected]
Desing & Developed BY Trust soft bd
,

শিউলি ফুলে হাসি

প্রিয় নোয়াখালীঃ ফজরের আজান হচ্ছে। শীতের ভোর।
এখনো ঠিকমতো আলো ফোটেনি চারপাশে। সুখেনপুর গ্রামে এবার বোধহয় শীতটা আগেভাগেই চলে এলো।

পানা পুকুরটার চারপাশে ছোট বড় খেঁজুর গাছের জটলা। কেউ লাগায় না, নিজের থেকেই হয়। বড় সবকটা গাছেই রস লাগায় নদী পাড়ের কুসুমকরির জামাই। তার একটা গাছে বেঁধে রাখা হাড়ি থেকে কী সুখ নিয়েই না রস খাচ্ছে পাখিটা! পাশেই কালচে সবুজ রঙের ধানক্ষেত, ধানের শিষে শিশির বিন্দু!
একটি বসতবাড়ি দেখা যাচ্ছে! টিনের চালায় লাউ গাছটার লতা এখনও আড়মোড়া ভাঙেনি। এই শীত শীত সকালে ৯-১০ বছরের কাজল ঘুম থেকে উঠলো বেশ পড়িমড়ি করেই। চাদরটা গায়ে মুড়ি দিয়ে ঘর থেকে বের হয়েই দে ছুট। শুধু বললো, মা গেলাম! গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে প্রায় দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ছুটে যাচ্ছে কাজল।
– আজ আমাকে পেতেই হবে। আমি একদিনও পাই না। সবগুলো নিয়ে নেয় বড় গাঁয়ের ধামড়া ছেলেগুলো। আজ আমি সবার আগে গিয়ে সব নিয়ে নেবো।

সুখেনপুরের একমাত্র বড় বাড়ি হলো কাজী বাড়ি। এরা খানদানি বংশ। বর্তমান মালিক কাজী আজিজুর রহমানের বয়স প্রায় ৬০। ছেলেমেয়ে সবাই থাকে শহরে তবে গ্রামের মায়া ছেড়ে তিনি শহরে থাকতে রাজি হননি। তাছাড়া গ্রামের মানুষগুলো বিপদে আপদে নানা পরামর্শের জন্য তার ওপর নির্ভর করে। বড় পাঁচিলে ঘেরা এই বাড়ি নানা রকম ফুল আর ফল গাছে ভরা। গ্রামের অনেক মানুষেরই এই বাড়ির অন্দরমহল নিয়ে বেশ আগ্রহ রয়েছে।
কাজী বাড়ির দীর্ঘদিনের কাজের লোক নজরুল মিয়া নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজছে। হঠাৎ ছেলেপুলেদের ধুপ ধাপ পায়ের শব্দে বাগানের পেছনের দিকে ছুটে যায় নজরুল ।

একদল বাচ্চা দৌঁড়ে বের হয়ে যায় ভাঙা পাঁচিলের অংশ দিয়ে। যাওয়ার সময় ঢিঁল মেরে ক্ষেপিয়ে দিয়ে যায় নজরুল মিয়াকে।
কাজল ততক্ষণে এসে দাঁড়ায় কাজী বাড়ির গেটে। বড় বড় ছেলেগুলো আজও নিয়ে গেছে সব শিউলি। আজ চারদিন, প্রতিদিনই কাজল ফিরে যায় গেট থেকে।
ছোট একটা ছেলে প্রতিদিনই হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। বেচারা!

ব্যাপারটা ছাদের কার্নিশ থেকে কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছেন কাজী আজিজুর রহমান। ফজরের নামাজের জন্য বেশ তাড়াতাড়িই উঠতে হয় তাকে। ইদানীং অবশ্য রাতে ঘুমই হয় না। বয়সটাও বাড়ছে হু হু করে! স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়িটা যেন এক বিরাণ ভূমি। বেশির ভাগ ফুলের চারাই অযত্নে অবহেলায় মরে গেছে। বাকি আছে শুধু ওই শিউলি গাছটা। ফলের কিছু গাছ অবশ্য এখনো টিকে আছে নজরুলের কল্যাণে। অপরিচিত বাচ্চাটার করুন মুখটা সাঁঝ সকালে মনটাই খারাপ করে দেয়।
আরেকটা ভোর আসে, কাজল যথারীতি উপস্থিত। তবে আজও সে শূন্যহাতে দাঁড়িয়ে আছে, চোখ ছলচল! কাজী সাহেব নজরুলকে আদেশ দিলো বাচ্চাটিকে তার কাছে নিয়ে আসার জন্য। নজরুল খুব আনন্দ নিয়ে কাজলকে টেনে নিয়ে গেল কাজী সাহেবের কাছে। আজই তগো কপালে খারাবি আছে! ফুল চুরি করো না?
কাজল কাছে গিয়েই বলতে লাগলো,
– আমি তো চুরি করিনি। গাছের নিচে পড়ে থাকা ফুলগুলো নিতে আসি, তাও পাই নাই একদিনও! বড় ছেলেগুলো নিয়ে যায়। তবুও আমাকেই কেন ধরে নিয়ে আসলেন।
কাজী সাহেব কান্নাভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কি নিষ্পাপ একটা মুখ। কাজী সাহেব হাত বাড়িয়ে এক ঝুড়ি শিউলি ফুল তুলে দিলো কাজলের হাতে। কাজল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। কাজী সাহেব বললেন, আমি এখন থেকে তোর জন্য ফুল রেখে দেবো! নিয়ে যাস। কটমট চোখে কাজী সাহেবের আদর আদর আচরণ দেখে থাকে নজরুল মিয়া। তার ধারণা ছিলো উল্টো। – যখনই কাজী সাহেব কাজলকে ফুলের ঝুড়িটা দিতে যাবে নজরুল বলে ওঠে -সাহেব ওদের ফুল দেন কেন? এরা আমাগো ফুল দিয়া বেদাতি কাম করবো! পূজা দিবো! আর আমাগো পাপ হইবো! কাজী সাহেব এবার হাসতে হাসতে বলে উঠলেন- থামতো নজরুল..বাচ্চা মানুষ !..ওর মন খারাপ হলে পাপ আরো বেশী হবে !!

কাজল ঝুড়ি হাতে ছুটলো বাড়ির দিকে। বাড়ি ফিরেই ডাকলো মাকে। ঐ তো মা। কাজল মায়ের আঁচল ধরে টান দিলো। সাদা শাড়ি, হাতে শাখা, সিঁথিতে সিঁদুর মাখানো এক শ্যামবর্ণ মুখ কিছুটা উৎকণ্ঠা নিয়ে ফিরলো কাজলের দিকে।
– কিরে আজও পাসনি। তুই কেন যাস বলতো! এত কষ্ট করে মন খারাপ করে ফিরিস। ফুল ছাড়াও পূজো হয়। দেবতা কি ফুল দেখেন! দেবতা ভক্তি দেখেন।
কাজল বলে, – কিন্তু তুমি যে শিউলি পছন্দ করো। বলেছিলে না যে একদিন! তাই তো আনতে যাই তোমার জন্য।
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে হাসলো সন্ধ্যা।
ছেলেটাই তার সম্বল! এই গ্রামে বেশ কিছু হিন্দু ঘরের বসবাস। সবাই ছোটখাট কাজ করে। ভালো একটু রোজগারের আশায় কাজলের বাবা গেছে শহরে। মাসে একবার আসে ঘরে। ছেলেটাকেই নিয়ে কাটে সময়।
পূজায় ফুল লাগে। তবে এদিকে ফুলের আকাল থাকায় ফুল ছাড়াই পূজা করতে হয়। তবে কাজল কিভাবে যেন জানলো কাজী বাড়ি থেকে অনেকেই ফুল আনে পূজার জন্য। তাই মায়ের জন্য সাত সকালেই ছোটে কাজী বাড়ি।
এই নাও তোমার ফুল, বলেই পেছন থেকে ঝুড়ি ভর্তি শিউলি দিলো মা’র হাতে। মা ছেলের কপালে চুমো খেয়ে ফুলগুলো দিয়ে পূজা শুরু করলো দেয়ালে টাঙানো দেবতার ছবির সামনে।
এরপর থেকে কাজল প্রতিদিনই যায় কাজী বাড়ি। তবে খুব চিন্তিত থাকে না যে ফুলগুলো ছেলেরা নিয়ে যাবে নাতো এই ভেবে।
কাজী সাহেব আজানের আগেই ঘুম থেকে ওঠেন। কোনদিনই নামাজ কাজা হয়নি তাঁর। শিউলিগুলো সাদা চাদরের মতো বিছানো থাকে নিচে। নজরুলকে বললেই কুড়িয়ে দিবে। তবে নিজে তুলতে এক ধরনের আনন্দ লাগে, মনে হয় ছেলেবেলায় ফিরে গেছেন। এই গ্রামেই তার বেড়ে ওঠা ! ছেলে বেলায় এই বাড়িতেই ছিল বিশাল বাগান ! হরেন কাকার বউ ঘোমটা দিয়ে খুব লাজুক ভাবে সকালে আসতো , মা আর উনি দুজন মিলে কুড়াতো নানা রকমের ফুল । দুজনের ভাব ছিল বেশ ! পূজার সময় কত যে নাড়– যে খাওয়া হতো কাকীর হাতে। গ্রামে এখন সেই সময় নেই ! কোথাও কোথাও সংঘর্ষের খবরও পান তিনি ! কেন এমন হলো মানুষ গুলো ! আগে তো মানুষ এখনের চেয়ে বেশী ধার্মিক ছিল। কই হিন্দু- মুসলিমে এত ঝামেলা তো হত না! আফসোস মানুষ বোধ হয় ধর্ম কি তাই জানে না । !

– যখন কাজলকে ঝুড়িটা দেওয়া হয় কী যে খুশি হয় ছেলেটা। মনটাই তাজা হয়ে যায়। ফুলগুলো তুলতে তুলতে ফজরের আজান দিয়ে দেয়। নামাজে যেতে হবে। কাজলের জন্য ঝুড়িটা রেখেই নামাজ পড়তে যান কাজী সাহেব। এক ঝুড়ি শিউলি প্রতি সকালে হাসি ফোটায় কয়েকটি মুখে! এটাই শিউলির ধর্ম ।

Share Button

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



web-ad

সর্বশেষ আপডেট





সম্পাদক ও প্রকাশক:: কামরুল ইসলাম কানন।
যোগাযোগ:: ০১৭১২৯৮৩৭৫১।
ইমেইল [email protected]

Developed BY Trustsoftbd